টি শার্ট প্রিন্টের আদ্যোপান্ত A-Z

টি শার্ট ব্যবসার পরিকল্পনা থাকলে টি শার্ট প্রিন্ট সম্পর্কে ধারনা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। টি শার্ট নিজে উৎপাদন করে ব্যবসা করলে অথবা এক কালার টি শার্ট কিনে ব্যবসা করলে, নতুবা নিজে টি শার্ট প্রিন্টিংয়ের ব্যবসা করলে, যেভাবেই হোক না কেন, টি শার্টের ব্যবসা করলে প্রিন্টিং সম্পর্কে ধারনা থাকাটা অতি প্রয়োজন।

টি শার্ট প্রিন্ট মূলত তিন ভাবে করা হয়ে থাকে।
১. স্ক্রিন প্রিন্ট
২. হিট ট্রান্সফার
৩. সাব্লিম্যাশন

স্ক্রিন প্রিন্ট

স্ক্রিন প্রিন্ট এক ধরনের ছাপার পদ্ধতি, স্ক্রিনের মাধ্যমে ছাপা হয় তাই সাধারণত স্ক্রিন প্রিন্ট বলা হয়ে থাকে। স্ক্রিন প্রিন্টের খরচ তুলনামূলক হারে কম বলে বহুল পরিচিত এবং স্ক্রিন প্রিন্ট স্থায়ীভাবে কাজ করে। স্ক্রিন প্রিন্ট দুই ধরনের হয়। লোকাল আর এক্সপোর্ট। কাঠের ফ্রেম অথবা মেশিনের সাথে স্ক্রিন বসিয়ে উপরে রং এর প্রলেপ দিয়ে এই প্রিন্ট করা হয়। স্ক্রিন প্রিন্টের মাধ্যমে শুধু কাপড় নয়, কাগজ, মগ, প্লাষ্টিকের পণ্য ছাপা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ঘরে বসেই এই স্ক্রিন প্রিন্ট করা যায়।

উপকরণ, ক্যামিকেল এর দোকানে পাওয়া যায়, কাঠের ফ্রেমের সাথে স্ক্রিন বসিয়ে ‍উপরে রং এর প্রলেপ দিয়ে এগুলো লোকাল প্রিন্ট বলে। কোন উৎসবে বা ইভেন্টের জন্য নিজেদের মধ্যে তৈরী করে নিতে পারবেন কিন্তু ব্যবসা বা ব্রান্ডিং এর ক্ষেত্রে এক্সপোর্ট প্রিন্ট টা করতে হবে।

এক্সপোর্ট প্রিন্টে মেশিনের মাধ্যমে কয়েক ধরনের রং এর প্রলেপ দেয়া হয় এবং প্রতিবার রং এর প্রলেপ দেয়ার পর ড্রায়ার দিয়ে প্রিন্টটা শুকানো হয়ে থাকে, তারপর ফিনিশিং করা হয়। এই কাজ করতে হলে স্ক্রিন প্রিন্ট এর দোকানে গিয়ে করাতে হবে। এক কথায়, মেশিনের মাধ্যমে রং এর প্রলেপ দিয়ে স্ক্রিন প্রিন্ট এর এক্সপোর্ট প্রিন্ট করা হয়।

আর কাঠের ফ্রেম দিয়ে হাতের সাহায্যে রং এর প্রলেপ দিয়ে যে স্ক্রিন প্রিন্ট হয় সেটা লোকাল প্রিন্ট। তবে দীর্ঘদিন ব্যবসায় টিকে থাকতে হলে স্ক্রিন প্রিন্ট এর মানসম্মত প্রিন্ট হল এক্সপোর্ট প্রিন্ট।

উপকরণ

রঙের ডিজাইনের পজেটিভ
এক কালার টি শার্ট
স্ক্রীন ৪০ নাম্বার
সেনোকেট (পরিমাণমত)
পটাশিয়াম বাই ক্রোনাইড (পরিমাণমত)
আইপি আই (পরিমাণমত)
বেনজিন (পরিমাণমত)
রিমুভার (পরিমাণমত)
ব্লিচিং পাউডার (পরিমাণমত)

এই সকল কেমিক্যালের উপকরণ দিয়ে টি শার্টে স্ক্রীন প্রিন্ট করা হয়ে থাকে।

নোটঃ একেক ধরনের কাপড় বা পেপারের জন্য একেক ধরনের স্ক্রীন ব্যবহৃত হয়, যেমন- বিছানার চাদর/ টেবিল ক্লথ/ ফলোমেট কার্পেট পেপার ইত্যাদি। টি শার্টের জন্য ৪০ নাম্বার স্ক্রীন লাগবে।

হিট ট্রান্সফার

হিট ট্রান্সফার একটি সহজ পদ্ধতি। ট্রান্সফার পেপার এ হিট প্রেস করে প্রিন্ট করা হয়। প্রথমে গ্রাফিক্স ডিজাইনারের মাধ্যমে টি শার্ট ডিজাইন করে নিন অথবা অনলাইনে টি শার্টের অনেক ডিজাইন আছে। যদি পারেন নিজে ইলাষ্ট্রেটর এর মাধ্যমে বা অন্য কোন সফটওয়্যারে একটি সুন্দর ডিজাইন তৈরি করুন।

নিজের ইচ্ছামত কিছু কথা লিখে নিন, ছবিও ব্যবহার করতে পারেন। যেভাবেই হোক না কেন প্রথমে একটি টি শার্টের ডিজাইন তৈরি করে ফটো প্রিন্টার অথবা লেজার প্রিন্টারে মিরর এফেক্ট দিয়ে ট্রান্সফার পেপারে প্রিন্ট করা হয়। তারপর প্রিন্ট করা অংশটুকু রেখে সাইটের বাকী এক্সট্রা অংশটুকু কেটে ফেলা হয়। তারপর প্রিন্ট করা ট্রান্সফার পেপারটি এক কালার টি শার্টের উপর রেখে হিট প্রেস করে ৫ মিনিট চাপ দিয়ে রাখলে ডিজাইনটি টি শার্টের মধ্যে স্টিকারের মত বসে যায়। তারপর হিট মেশিন তুলে ট্রান্সফার পেপারটি টান দিয়ে উঠালে ডিজাইন হয়ে গেল।

এই পদ্ধতিতে সময় খুব কম লাগে, খরচও কম এবং কমন একটি পদ্ধতি। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ আয়রন মেশিন (বৈদ্যুতিক ইস্ত্রি) দিয়ে নিজে নিজেই ঘরে বসে এই প্রিন্ট করা যেতে পারে।

উপকরণ

টি শার্ট এক কালার।
ট্রান্সফার পেপার (টেক্সটাইল)।
আয়রন (ইস্ত্রি) অথবা হিট প্রেস মেশিন।
ফটো প্রিন্টার / লেজার প্রিন্টার / প্রেস প্রিন্টার

নোটঃ নরমাল কোন ট্রান্সফার পেপার দিয়ে টি শার্টে ডিজাইন ট্রান্সফার করা যায় না। সেক্ষেত্রে টেক্সটাইল ট্রান্সফার পেপারই লাগবে। অন্য নাম টেক্সটাইল মিডিয়া পেপার।

সাব্লিম্যাশন

এই পদ্ধতিতে খুব ভাল কোয়ালিটির ডিজাইন তৈরী করা হয় কিন্তু একটু ব্যয়বহুল। মূলত রং কে হিট দিয়ে গ্যাস এ পরিণত করে টি শার্টে স্থানান্তর করা হয়। এতে সিন্থেটিক ম্যাটেরিয়াল ব্যবহৃত হয় নাইলন এ কাজ করে। আগে প্লেট বা ডাইস তৈরি করে নিতে হয়, এর জন্য বিশেষ কিছু রং ব্যবহৃত হয়। হিট মেশিন ব্যবহার করে স্প্রে করে ভালো মানের একটি প্রফেশনাল ডিজাইন তৈরি করা হয়।

অনেক ধরনের উন্নতমানের যন্ত্রপাতি দিয়ে এই কাজ করা হয় তাই বাজেট একটু বেশি । আধুনিক যন্ত্রপাতির দ্বারা খুব কম সময়ে দ্রুত ডিজাইন তৈরি করা যায়। টি শার্ট ছাড়াও সাব্লিম্যাশন সাপোর্ট করে জার্সি, সিরামিক মগ, প্লেট, টাইলস, ক্রেস্ট, মেটাল, বোর্ড, ক্রিস্টাল, ফটো ফ্রেম, মাউস প্যাড, কুশন কভার, চাবির রিং, ক্যাপ, টাই ইত্যাদি তৈরি করা হয়।

উপকরণ

এপসন প্রিন্টার / ইন্কজেট
প্রিন্টার
সাব্লিম্যাশন কালার
সাব্লিম্যাশন পেপার
থারমাল হিট টেপ
সিন্থেটিক ম্যাটেরিয়াল
ডিজিটাল কম্বো হিট প্রেস মেশিন।

সাব্লিম্যাশন কোটেড পণ্য (যেমন- টি শার্ট, জার্সি কাপড়, নায়লন, পলিষ্টার কাপড়, মিক্স কাপড় 35/65, পি পি কাপড় ইত্যাদি)।

কোথায় প্রিন্ট করাবেন এবং কত খরচ হবে?

ঢাকার বিভিন্ন জায়গাতে টি শার্ট প্রিন্টের দোকান রয়েছে, এর মধ্যে গুলিস্থানের ফুলবাড়িয়ার সিটি প্লাজা বা নগর প্লাজায় প্রিন্ট করাতে পারেন। দোতলা, যেটাকে ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট ২ বলা হয়। আপনি যে কোন স্থান থেকে ফুলবাড়িয়া নামলে এরপর সিদ্দিক বাজার হয়ে সামনে মোড় পাড় হলেই সিটি প্লাজা দেখতে পাবেন। ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেটে গেলে দেখবেন দু-চার জন আপনাকে ডাকাডাকি করছে। এরা হলেন স্ক্রীন প্রিন্ট ব্যবসায়ী।

নূন্যতম 50 পিছ টি শার্ট ডিজাইন করলে স্ক্রীন প্রিন্টে 25-30 টাকা পার পিছ করে রাখে। তবে পরিমাণে বেশি হলে যেমন- 150-200 পিছ ডিজাইন করালে 10-20 টাকার মধ্যে স্ক্রীন প্রিন্ট করিয়ে আনতে পারবেন।

আবার গুলিস্থানের সমবায় টুইন টাওয়ারে 5-6-7নং ফ্লোরে প্রচুর স্ক্রীন প্রিন্টের দোকান আছে। স্ক্রীন প্রিন্টের দোকানের পাশে যোগাযোগ করলে হিট-ট্রান্সফার প্রিন্টের লোকেশনও পেয়ে যাবেন। তবে দাম সমান সেক্ষেত্রে স্ক্রীন প্রিন্ট করানো ভাল আমার মতে। কারণ হিট ট্রান্সফার প্রিন্টগুলো ওয়ান-টাইম। ইভেন্টের জন্য ঠিক আছে তবে লাইফটাইম বিজনেস করলে স্ক্রীন প্রিন্ট লাগবে।

যাদের বাজেট একটু ভালো এবং চাইছেন টি শার্ট দিয়ে ব্রান্ডিং করবেন, নিজস্ব একটা ব্রান্ড তৈরী করতে চান নিজস্ব ডিজাইন ও নাম দিয়ে এবং ই-কমার্স ব্যবসার মাধ্যমে অনলাইনে নিজস্ব টি শার্ট ব্রান্ডিং নিয়ে ব্যবসা করতে চান, লাইফটাইম ভালো একটি কোয়ালিটি তুলে ধরতে চান, তারা সাব্লিম্যাশন প্রিন্ট করাতে পারেন। প্রতি পিছ টি শার্টে 70-80 টাকা এমনকি 100 টাকাও প্রতি পিছ টি শার্টে প্রিন্ট বাবদ খরচ হয়।

ঐ সকল প্রতিষ্ঠান ঢাকার আরামবাগে, নীলক্ষেতে রয়েছে। তাছাড়া, শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেট, নয়া পল্টনে পলওয়েল সুপার মার্কেট, বঙ্গবাজারে ও নিউমার্কেটে চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটে খোজ করলে পাওয়া যাবে।

তাছাড়া ইউটিউবে সাব্লিম্যাশন পদ্ধতি ও ঠিকানার অনেক ভিডিও আছে যারা ভালো রেট প্রভাইড করে। তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে সাব্লিম্যাশন প্রিন্ট করাতে পারেন।

লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ, প্রয়োজনীয় মনে হলে শেয়ার করুন ফেসবুকে।


প্রশিক্ষণ

স্ক্রীন প্রিন্ট শুরুর আগে অভিজ্ঞ কারও সহযোগী হিসেবে কিছুদিন কাজ করলে ব্যবসার বিস্তারিত জানা যাবে। এই ব্যবসা করতে হলে কিছুটা লেখাপড়া জানলে ভালো। তাহলে অর্ডার বুঝে নেওয়ার সুবিধা হবে। এছাড়া উদ্যোক্তাকে সৃজনশীল হতে হবে। কারণ নতুন নতুন ধারণা ও ডিজাইন তৈরি করতে না পারলে প্রতিযোগীতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠান (কারিগরি স্ক্রীন প্রিন্টিং প্রশিক্ষণ), ” ভর্তি ফর্ম ” সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান স্ক্রীন প্রিন্টের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থের বিনিময়ে স্ক্রীন প্রিন্টের প্রশিক্ষণ নেওয়া সম্ভব।

Leave A Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Cart
Your cart is currently empty.